
অ্যাডভোকেট মোঃ এনামুল হক
আজ থেকে দশ বছর পরে মিলিয়ে দেখবেন আজকে যুক্ত হওয়া নতুন আইনে মোট কতজনের ফাঁসির সাজা হয়েছে, আর এতে মাদকের অপরাধ কতখানি কমেছে। এখন আরেকটু আলোচনা করি, মাদক কেনাবেচার সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান ফৌজদারি আইন, সেন্টেন্সিং পলিসি ও অপরাধবিজ্ঞানের মৌলিক নীতির সঙ্গে কিভাবে সাংঘর্ষিক।
আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর)-এ স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কেবল 'মোস্ট সিরিয়াস' ক্রাইমের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড আরোপ করতে পারে। ড্রাগ রিলেটেড অফেন্সকে মোস্ট সিরিয়াস ক্যাটেগরির অফেন্স হিসেবে ধরা হয় না। ইন্টেনশনাল কিলিং হচ্ছে মোস্ট সিরিয়াস ক্যাটেগরির অফেন্স।
মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু কঠোর শাস্তির বিধান হিসাবে মৃত্যুদণ্ড যুক্ত করা আর ন্যায়বিচার এক জিনিস নয়। এই পলিসি কার্যকরও নয়। সাইবার মাধ্যমে মাদক কেনাবেচার অপরাধে বাধ্যতামূলক মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান ফৌজদারি আইন, সেন্টেন্সিং পলিসি ও অপরাধবিজ্ঞানের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রথমত, শাস্তি বা দণ্ড অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। মাদক কেনাবেচা গুরুতর অপরাধ, কিন্তু এটি হত্যাকাণ্ডের মতো গুরুতর নয়। তাই মৃত্যুদণ্ড এখানে অসামঞ্জস্যপূর্ণ (disproportionate) শাস্তি।
দ্বিতীয়ত, একই শাস্তি সবার জন্য ন্যায়বিচার নয়। একজন মাফিয়া ড্রাগলর্ড, মাদক পাচারকারী, আন্তর্জাতিক মাদকচক্রের হোতা, একজন কুরিয়ার, একজন প্রথমবারের অপরাধী বা আসক্তির কারণে কেনাবেচায় জড়ানো ব্যক্তি - সবার অপরাধ ও দায় এক নয়। সকল কেনাবেচার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলে ছোট বড়ো সবাই একই সাজা পাবে।
তৃতীয়ত, মৃত্যুদণ্ড যে খুবই কার্যকর এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। অপরাধবিজ্ঞানের গবেষণা বলছে, শাস্তির কঠোরতার চেয়ে ধরা পড়ার নিশ্চয়তা অপরাধ দমনে বেশি কার্যকর। ২০১৮ সালে ২০০ গ্রামের বেশি ইয়াবা অথবা ২৫ গ্রামের বেশি হেরোইন বা কোকেন বহনের দায়ে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এখনও পর্যন্ত হাতে গোণা কয়েকটা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে। কার্যকর হয়নি একটাও। কিন্তু ২০১৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাদকের ভয়াবহতা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। এর অর্থ হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডের সাজা অপরাধ কমাতে ভূমিকা রাখে না।
আজ থেকে দশ বছর পরে মিলিয়ে দেখবেন আজকে যুক্ত হওয়া নতুন আইনে মোট কতজনের ফাঁসির সাজা হয়েছে, আর এতে মাদকের অপরাধ কতখানি কমেছে।
চতুর্থত, সাইবার অপরাধে ভুল বিচারের ঝুঁকি বেশি। ভুয়া আইডি, হ্যাকড অ্যাকাউন্ট, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও মধ্যস্থতাকারীর কারণে প্রকৃত অপরাধী শনাক্ত করা অনেক সময় জটিল হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে মাদকদ্রব্য উদ্ধারের বাধ্যবাধকতা নাই। এর ফলে মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা, মামলা বাণিজ্য, ফাঁসিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আইন যত কঠোর, অপব্যবহারের সম্ভাবনা তত বেশি। বট আইডি, ফেক পেইজের আইডেন্টিটি ধরতে পারে না এখনও পর্যন্ত, সেখানে মাদক কারবারি ধরবে কীভাবে?
মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে একটি ভুল রায় আর সংশোধন করা যায় না। তাই মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে দক্ষতাসম্পন্ন বিচারকগণ অধিকতর সতর্কতা অবলম্বন করেন। এর ফলে সাজার হার কমে। যে পরিমাণ সাক্ষ্য প্রমাণ থাকলে একজন মানুষকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা যায় তার চেয়ে অনেকগুণ বেশি নিখুঁত সাক্ষ্যপ্রমাণ প্রয়োজন হয় ফাঁসির সাজা দিতে। কোর্টের নীতি হচ্ছে ফাঁসির সাজা হবে রেয়ারেস্ট অব রেয়ার কেইসে। কিন্তু সংসদের আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হচ্ছে পাইকারি হারে।
সাইবার স্পেসে কেউ সঠিক পরিচয় ব্যবহার করে মাদকের ব্যবসা করবে না। এক্ষেত্রে কোনো আইডি বা একাউন্টের প্রকৃত মালিক খুঁজে বের করা কঠিন কাজ। এক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তির সুযোগ থাকে। এরকম একটা সেনসিটিভ সারকামস্ট্যান্সেসে মৃত্যুদণ্ডের সাজা দিলে নির্দোষ মানুষের চরম সাজা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
পঞ্চমত, বাস্তবে বড় মাদক ব্যবসায়ীরা আড়ালেই থেকে যায়। পাচারকারী, আমদানিকারক বা গডফাদাররা ধরা পড়ে না। ধরা পড়ে কুরিয়ার, খুচরা বিক্রেতা বা ছোট সহযোগীরা। ফলে মৃত্যুদণ্ড প্রকৃত হোতাদের নয়, বরং নিচের স্তরের ব্যক্তিদের ওপরই বেশি প্রয়োগ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এতে অপরাধ কমবে না। একজন ধরা পড়লে আরেকজনকে দিয়ে রিপ্লেস করা তাদের জন্য খুবই সহজ কাজ।
মাদক নির্মূল করতে হলে উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন ধ্বংস করতে হবে। এগুলো করতে আইনের প্রয়োজন নাই। প্রশাসনিক পদক্ষেপ দরকার। এক্ষেত্রে এসিড সন্ত্রাস নির্মূলের কথা বলা যায়। এসিড মারার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়ে এসিড সন্ত্রাস বন্ধ হয়নি৷ বরং এসিডের উৎপাদন ও বিপণন কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার কারণে এসিড সন্ত্রাস কমেছে।