নওগাঁ প্রতিনিধিঃ
নওগাঁর মান্দায় বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদকে সংসদ সদস্যের বাসভবনের ‘টর্চার সেলে’ নিয়ে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের মামলার প্রধান আসামি মোহাম্মদ আলী এখন ‘টক অব দ্য টাউন’। পুলিশের খাতায় তিনি ‘পলাতক’ থাকলেও গতকাল ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের র্যালিতে তাকে প্রকাশ্যে রাজপথ কাঁপাতে দেখা গেছে। র্যালির সামনের সারিতে বীরদর্পে তার এই উপস্থিতির ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে চরম ক্ষোভ ও হাস্যরসের সৃষ্টি হয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়দের প্রশ্ন যাকে পুরো মান্দাবাসী দেখল, পুলিশ তাকে কেন খুঁজে পাচ্ছে না? নাকি ক্ষমতার অদৃশ্য সুতোর টানে পুলিশ ‘চোখ থাকতেও অন্ধ’ সেজে আছে?
গত ৫ এপ্রিল প্রসাদপুর বাজারে প্রকাশ্য দিবালোকে উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক আবুল কালাম আজাদকে তুলে নিয়ে সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপুর বাসভবনের নিচে আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন চালানো হয়। এতে তার কানের পর্দা ফেটে যায়। এ ঘটনায় ১১ এপ্রিল মান্দা থানায় মামলা হলেও রহস্যজনক কারণে প্রধান আসামি মোহাম্মদ আলীকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। গত সোমবার নওগাঁর আদালতে ৪ আসামি আত্মসমর্পণ করলেও ১ নম্বর আসামি মোহাম্মদ আলী ও ৩ নম্বর আসামি শহিদুল ইসলামকে ‘পলাতক’ হিসেবে দেখানো হয়। অথচ গতকালের র্যালিতে মোহাম্মদ আলীর সরব উপস্থিতি পুলিশের দাবিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, পুলিশের তৎপরতা এখন ‘পছন্দ-অপছন্দ’র ওপর নির্ভর করছে। মৈনম ইউনিয়নে জমি সংক্রান্ত একটি তুচ্ছ বিরোধের ‘গায়েবি’ মামলায় মাদ্রাসা শিক্ষক মেহেদী হাসানকে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়াই ঝটিকা অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। অথচ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বাড়িতে হামলা-লুটপাট কিংবা বিএনপি নেতাকে টর্চার সেলে নির্যাতনের মতো গুরুতর মামলার আসামিরা পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে ঘুরে বেড়ালেও তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না। পুলিশের এই ‘দ্বিমুখী’ আচরণে উপজেলাজুড়ে সমালোচনার ঝড় বইছে।
এদিকে বিএনপি নেতার ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে এবং আসামিদের গ্রেপ্তারের দাবিতে গত কয়েকদিন ধরে মান্দায় পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি চলছে। সোমবার বিএনপির সংবাদ সম্মেলন এবং সন্ধ্যায় এমপির পক্ষে ছাত্রদলের একাংশের মিছিলের পর মঙ্গলবার প্রসাদপুর বাজারে এমপির সমর্থিত অপর একটি অংশও বিক্ষোভ মিছিল করেছে। রাজপথ দখলের এই লড়াইয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হলেও জনমনে স্বস্তি ফিরছে না।
আদালতে বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কুমার বিশ্বজিৎ সরকার জানান, আসামিরা দুর্ধর্ষ এবং তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে যা মামলার তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে। অন্যদিকে বিবাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট শওকত ইলিয়াস কবির জামিন পাওয়া আসামিদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।
নির্যাতনের শিকার আবুল কালাম আজাদের পরিবার এখন ন্যায়বিচারের আশায় প্রহর গুনছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, একজন চিহ্নিত আসামি যদি পুলিশের উপস্থিতিতেই রাজপথে মিছিল করতে পারে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে আইনের শাসনের কোনো মূল্য থাকে না। দ্রুত প্রধান আসামিদের গ্রেপ্তার করা না হলে পরিস্থিতি যেকোনো সময় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।