নওগাঁ প্রতিনিধিঃ
নওগাঁর মান্দা উপজেলার চকহরিনারায়ণ দাখিল মাদ্রাসার প্রশাসনিক শৃঙ্খলা এখন খাদের কিনারে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রতিষ্ঠানটিকে ‘পারিবারিক ব্যবসায়’ রূপান্তরের অভিযোগ উঠেছে খোদ সুপারেনটেনডেন্ট আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে। একদিকে ৬ বছর কর্মস্থলে অনুপস্থিত কর্মচারীর বেতন তুলে অর্থ আত্মসাৎ, অন্যদিকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিজের মেয়েকে নিয়োগ দেওয়ার আয়োজন সব মিলিয়ে মাদ্রাসাটিতে চলছে এক লঙ্কাকাণ্ড। এলাকাবাসীর অভিযোগের পর প্রশাসনের তদন্ত শুরু হলেও নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে বিচার পাওয়া নিয়ে শঙ্কিত স্থানীয়রা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিষ্ঠানটির মোজাফ্ফর হোসেন নামে এক কর্মচারী প্রায় ৬ বছর ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত। অথচ কাগজ-কলমে তাকে উপস্থিত দেখিয়ে নিয়মিত সরকারি বেতন (এমপিও) উত্তোলন করা হচ্ছে। গত ৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কার পকেটে গেছে, তা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। শিক্ষা অফিসের যোগসাজশ ছাড়া দীর্ঘ সময় এমন জালিয়াতি সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা। স্থানীয়দের প্রশ্ন যিনি প্রতিষ্ঠানেই আসেন না, তার পে-শিটে স্বাক্ষর করেন কে?
মাদ্রাসার শূন্য পদগুলোতে নিয়োগের জন্য যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, সেটিও চাতুর্যের আশ্রয় নিয়ে নামসর্বস্ব পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। মূল লক্ষ্য সুপারের নিজের ছোট মেয়ে উম্মে আঁখি আক্তারকে ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্ট পদে বসানো। নিয়োগ কমিটিতে সুপার নিজে সদস্য সচিব পদে থেকে নিজের মেয়েকে প্রার্থী করা ‘স্বার্থের সংঘাত’ হলেও এর তোয়াক্কা করেননি তিনি। এছাড়াও পিয়ন পদে নিয়োগের নাম করে একাধিক প্রার্থীর কাছ থেকে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এখন ইউএনও এবং ডিসির টেবিলে।
এলাকাবাসীর পক্ষে মো. জাকির হোসাইনের দাখিল করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ম্যানেজিং কমিটির অনেক সদস্যকে না জানিয়েই তড়িঘড়ি করে সভার রেজুলেশন করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ফাঁকা রেজুলেশন খাতায় স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও পাওয়া গেছে। আফজাল হোসেন নামে এক ভুক্তভোগী আক্ষেপ করে বলেন, “চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া হয়েছে। এখন নিয়োগও দিচ্ছে না, টাকাও ফেরত দিচ্ছে না। উল্টো হুমকি দেওয়া হচ্ছে।”
সব অভিযোগ অস্বীকার করে মাদ্রাসার সুপারেনটেনডেন্ট আব্দুল মান্নান বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। নিয়োগের ক্ষেত্রে সকল সরকারি বিধিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে। কোনো ধরনের অনিয়ম করা হয়নি। একটি পক্ষ ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমার সম্মানহানি করার চেষ্টা করছে।” তবে ৬ বছর অনুপস্থিত কর্মচারীর বেতন উত্তোলনের বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখতার জাহান সাথী বলেন, “চকহরিনারায়ণ দাখিল মাদ্রাসার নিয়োগে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। বিশেষ করে অনুপস্থিত কর্মচারীর বেতন উত্তোলন ও নিয়োগে অনিয়মের বিষয়টি তদন্তে প্রমাণিত হলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দুর্নীতির কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না।”
চকহরিনারায়ণ সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, পূর্বপুরুষদের দান করা জমিতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটি কোনো ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হতে পারে না। অবিলম্বে বর্তমান নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত করে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন এবং জালিয়াতির সাথে জড়িতদের বরখাস্তের দাবি তুলেছেন তারা।
তদন্তের মাধ্যমে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে, নাকি অদৃশ্য ইশারায় ধামাচাপা পড়বে এই বড় অনিয়ম এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে নওগাঁর মান্দাবাসী।