• শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৮ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে রাজশাহীতে আলোচনা অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত নাচোলে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালিত পার্বতীপুরে জাতীয় বিপ্লব ও সংহিত দিবস পালিত,আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসে রাজশাহী মহানগর বিএনপির জাতীয় ও দলীয় পতাকা উত্তোলন ও বেলুন উড়িয়ে দিবসের কর্মসূচির উদ্বোধন কৃষিপণ্য আমদানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসাই সরকারের লক্ষ্য: কৃষিমন্ত্রী রাজশাহীতে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারের সেবার মান বাড়াতে কমিশনারের নির্দেশনা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় নওগাঁর মান্দায় কালিকাপুর ইউপি চেয়ারম্যান সাময়িক বরখাস্ত নওগাঁ জেলা জামায়াতের নেতৃত্বে পরিবর্তন, নতুন আমির মাহফুজুর রহমান নর্থ বেঙ্গল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রক্টরিয়াল টিমের সদস্য হলেন প্রভাষক আবু সাঈদ কুষ্টিয়ায় মৃত চেয়ারম্যানের নামে ১০৭ বস্তা চাল বরাদ্দ

সত্যের সন্ধানে নাগরিক সাংবাদিকতা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

দিনকাল বিডি ২৪ / ২৭৪ Time View
প্রকাশঃ রবিবার, ১৮ মে, ২০২৫

বিজয় কুমার,বিশেষ প্রতিনিধি :

প্রযুক্তির উত্থান ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এর ব্যাপক প্রসারের ফলে আজকের বিশ্বে নাগরিক সাংবাদিকতার গুরুত্ব দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণ মানুষ এখন মোবাইল ফোনের ক্যামেরা আর ইন্টারনেটের মাধ্যমে খবর ছড়িয়ে দিচ্ছে মুহূর্তেই। নাগরিক সাংবাদিকতা (Citizen Journalism) এমন একটি ধারার নাম যেখানে সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক না হয়েও তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, প্রতিবেদন এবং প্রচারে অংশগ্রহণ করে। অথাৎ প্রতিটি নাগরিকই এখন একজন সাংবাদিক।
নাগরিক সাংবাদিকতা হলো আধুনিক সমাজে তথ্য ও মত প্রকাশের এক উদীয়মান শক্তি। যা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরে এবং সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা ঘটাতে পারে। আগে যেখানে সংবাদ সংগ্রহ ও প্রচার ছিল কেবল পেশাদার সাংবাদিকদের কাজ, এখন সেখানে একজন সাধারণ মানুষও তার হাতে থাকা স্মার্টফোন বা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা রেকর্ড করতে পারেন এবং মুহূর্তেই তা প্রচার করতে পারেন।
নাগরিক সাংবাদিকতার সূচনা নির্দিষ্ট কোনো একদিনে হয়নি, বরং এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি ধারাবাহিক সামাজিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ফল।তবে ২০০০ সালের দিকে এটি সংগঠিত রূপ পায় । যদিও আসল বিকাশ ঘটে ইন্টারনেট ও ব্লগের মাধ্যমে (১৯৯০-২০০০ দশক)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে এটি এখন একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা ও শক্তিশালী সামাজিক হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।
নাগরিক সাংবাদিকরা মোবাইল ফোন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা ব্লগের মাধ্যমে দ্রুত যেকোনো ঘটনা প্রচার করতে পারেন। ঘটনার তাৎক্ষণিক ছবি বা ভিডিও বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। প্রাথমিক পর্যায়ে সংবাদ পেতে সহায়তা করে। নাগরিক সাংবাদিকরা সমাজের অন্যায়, বৈষম্য, বা মানবিক ঘটনা তুলে ধরে,তখন সাধারণ মানুষ আরও সচেতন হয়। নাগরিক সাংবাদিকদের রিপোর্টের মাধ্যমে অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনমত তৈরি হয়। অনেকে একত্রিত হয়ে আন্দোলনে যোগ দেন।
নাগরিক সাংবাদিকতার ফলে তথ্যের দ্রুত বিস্তার হচ্ছে, সাধারণ মানুষ হয়ে উঠছে সচেতন ও দায়িত্বশীল।মানুষ দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন।অথাৎ বিভিন্ন দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি মোবাইল ভিডিও বা লাইভে উঠে আসছে।ফলে খুব সহজে যেকোনো সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে।
যদিও মূলধারার গণমাধ্যমের সাথে নাগরিক সাংবাদিকতার পার্থক্য রয়েছে। তবে মূলধারার গণমাধ্যম এবং নাগরিক সাংবাদিকতা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয় বরং পরিপূরক। মূলধারার গণমাধ্যম কোনো তথ্য বিশ্লেষণ, যাচাই ও প্রসারিত করার কাজ করে আর নাগরিক সাংবাদিকতা দ্রুত তথ্য সরবরাহে ভূমিকা রাখে। মূলধারার গণমাধ্যমে কাজ করে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পেশাজীবী সাংবাদিকরা আর নাগরিক সাংবাদিকতায় যে কেউ তথ্য প্রচার করতে পারে। মূলধারার গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের আগে তথ্য যাচাই ও সম্পাদকীয় অনুমোদন লাগে; কিন্তু নাগরিক সাংবাদিকতা প্রায়শই তাৎক্ষণিক ও যাচাইবিহীন।
নাগরিক সাংবাদিকতা যেমন সমাজে তথ্য ছড়িয়ে দিতে এবং জনগণের কণ্ঠস্বর পৌঁছাতে বড় ভূমিকা রাখছে, তেমনি এর কিছু সমস্যা ও চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারণ, এটি সাধারণ মানুষের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যারা অনেক সময় সাংবাদিকতার পেশাগত নীতি ও প্রশিক্ষণ না জেনেই সংবাদ তৈরি করে।ফলে গুজব, বিভ্রান্তিকর তথ্য, বা একতরফা তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজান্তেই ভুল বা মিথ্যা তথ্য শেয়ার করেন।ফলে সামাজিক অস্থিরতা,সহিংসতা বা বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
নাগরিক সাংবাদিকদের অধিকাংশই সাংবাদিকতা বা সংবাদ তৈরির প্রথাগত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। এতে সংবাদে ভাষার ভুল, পক্ষপাত, অপূর্ণতা ইত্যাদি দেখা যায়। অনেকে অনুমতি না নিয়েই ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশ করেন।এতে করে ব্যক্তির সম্মানহানি বা গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ঝুঁকি থাকে। আবার,রাজনৈতিক,ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত উদ্দেশ্যে একতরফা বা উসকানিমূলক তথ্য ছড়ায় এতে করে সমাজে বিভাজন ও সংঘর্ষ বাড়ে।
নাগরিক সাংবাদিকতার জন্য নাগরিকদের তথ্য যাচাইয়ের জন্য মৌলিক কৌশল শেখানো দরকার। ফেসবুক, ইউটিউব, ব্লগে কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে সত্যতা নিশ্চিত করতে হবে।নাগরিকদের বিভিন্ন অনলাইন ভিডিও, ওয়েবিনার বা শর্ট কোর্সের মাধ্যমে তথ্য যাচাই শেখানো যেতে পারে।নাগরিকদের শিখাতে হবে কারো সম্মান বা গোপনীয়তা লঙ্ঘন না করে কীভাবে খবর পরিবেশন করা যায়। স্থানীয় বা জাতীয় পর্যায়ে “সিটিজেন জার্নালিজম ট্রেনিং” চালু করা যেতে পারে। এতে সংবাদ লেখার কৌশল, ভাষার ব্যবহার, ফ্যাক্ট-চেকিং, ছবি/ভিডিও নেওয়ার নিয়ম শেখানো হবে।
আইন ও নীতিমালা তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে হবে।এতে করে সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নাগরিক সাংবাদিকতার জন্য একটি নৈতিক ও দায়িতত্বশীল আচরণবিধি তৈরি করতে পারে।যাতে করে গুজব বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানোয় আইনের যথাযথ প্রয়োগ করা যেতে পারে,এতে করে জনগনের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বজায় থাকে।বা সাইবার সিকিউরিটি আইন শক্তিশালী করতে হবে যাতে করে কৈউ গুজব ছড়ালে ও মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করলে জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়। এবং ডিজিটাল রাইটস অ্যাক্ট প্রণয়ন করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা।
সামাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করতে হবে। অনেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বা অজ্ঞতাবশত ভুয়া খবর শেয়ার করে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করেন।ফলে সমাজের ব্যাপক ক্ষতি হয়।কারন একটা ভুল সংবাদ ব্যক্তি ,সমাজ ও রাষ্ট্রের ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে। ব্যক্তির জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
নাগরিক সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়, তবে চ্যালেঞ্জপূর্ণ। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক সচেতনতা এবং মানুষের তথ্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা যেভাবে বাড়ছে, তাতে নাগরিক সাংবাদিকতা ভবিষ্যতে গণমাধ্যমের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠবে। গণতন্ত্রের শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠবে নাগরিক সাংবাদিকতা। সাধারণ মানুষ যেহেতু অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে, দুর্নীতি তুলে ধরতে, মানবিক গল্প শেয়ার করতে পারছে, তাই নাগরিক সাংবাদিকতা ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে বড় ভূমিকা রাখবে।
নাগরিক সাংবাদিকতা মূলধারার গণমাধ্যমের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। নাগরিক সাংবাদিকরা তথ্য সংগ্রহ করবে, আর মূলধারার সাংবাদিকরা সেই তথ্য যাচাই করে বিশ্লেষণ করবে।
ফলে উভয়ের সম্মিলনে আরও নির্ভুল ও ব্যাপকতর সংবাদ ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। যেখানে মূলধারার সংবাদমাধ্যম পৌঁছাতে পারে না, সেখানে নাগরিক সাংবাদিকরা স্থানীয় ভাষায় স্থানীয় সমস্যা তুলে ধরতে পারবে। ফলে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা আরও জোরালোভাবে সামনে আসবে। গুজব, ভুল তথ্য কমবে।
নাগরিক সাংবাদিকতা হলো গণমাধ্যমের গণতন্ত্রীকরণ—যেখানে একজন সাধারণ মানুষও হয়ে উঠবে সত্য প্রকাশের বাহক। তবেএই ভবিষ্যৎ যেন ইতিবাচক হয়, তার জন্য দরকার প্রযুক্তি ব্যবহারের জ্ঞান, তথ্য যাচাইয়ের সক্ষমতা এবং নৈতিক সচেতনতা।
নাগরিক সাংবাদিকতা যেমন সামাজিক অবিচার উন্মোচনে সাহসী ভূমিকা রাখছে, তেমনি ভুয়া খবরের ছোবলে সমাজবিন্যাসকে করছে ক্ষতিগ্রস্ত। মোবাইল ফোন হাতে নিয়েই মানুষ অন্যায়ের প্রতিবাদ করছে, গৌণ ঘটনাকে সামনে নিয়ে আসছে এবং সত্যকে উন্মোচন করছে। নাগরিক সাংবাদিকতার এই জোয়ারকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানোর মধ্যেই নিহিত আছে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের চাবিকাঠি। আবার নাগরিক সাংবাদিকতার এই জোয়ার মূলধারার গণমাধ্যমকে যেমন চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে, তেমনি নতুন মাত্রাও যোগ করছে। প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারে এটি ভবিষ্যতের তথ্য-প্রবাহের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠবে, যদি আমরা সবাই দায়িত্বশীল হই ও সত্য প্রকাশে অটল থাকি।
লেখক: বিজয় কুমার
সাবেক শিক্ষার্থী
যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category