নওগাঁ প্রতিনিধিঃ
এক বুক স্বপ্ন আর জীবিকার তাগিদে সকালে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন আতিকুল ইসলাম ওরফে আকাশ (১৮)। কিন্তু কে জানত, সেই যাত্রাই হবে তার জীবনের শেষ যাত্রা! নওগাঁর মান্দায় মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটো চার্জার ভ্যানের মুখোমুখি সংঘর্ষে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন এই কর্মঠ যুবক। দুর্ঘটনায় সাগর ইসলাম (২৫) নামের অপর একজন গুরুতর আহত হয়ে বর্তমানে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে জীবনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। গত বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নওগাঁ-রাজশাহী মহাসড়কের উপজেলার ফেরিঘাট ব্রিজের পূর্ব পাশে শাপলা ফিলিং স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় এই হৃদয়বিদারক দুর্ঘটনাটি ঘটে।
নিহত আকাশ উপজেলার গনেশপুর ইউনিয়নের ভেবড়া গ্রামের এক সাধারণ ট্রাক্টর চালক আশরাফুল ইসলামের ছেলে। সংসারের হাল ধরতে সতীহাট বাজারের ‘দিগন্ত ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকম’-এ ডেলিভারি ম্যান হিসেবে দিনরাত খাটতেন তিনি। আহত সাগর একই ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের হাফিজুল ইসলামের ছেলে।
নিহতের স্বজন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনের মতোই বৃহস্পতিবার সকালে সতীহাট থেকে দোকানের মালামাল সাবাই হাটে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন আকাশ ও সাগর। কাজ শেষে মোটরসাইকেলে করে সতীহাটে ফেরার পথে ঘটে সেই অনাকাঙ্ক্ষিত বিপর্যয়। ফেরিঘাট ব্রিজের পূর্ব পাশে পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা একটি চলন্ত অটোচার্জার ভ্যানের সঙ্গে তাদের মোটরসাইকেলের প্রচণ্ড ধাক্কা লাগে। মুহূর্তের মধ্যে দুজনেই পিচঢালা সড়কে ছিটকে পড়ে গুরুতর আহত হন।
রক্তাক্ত অবস্থায় স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে প্রথমে মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে অবস্থার দ্রুত অবনতি হতে থাকলে চিকিৎসকরা তাদের জরুরি ভিত্তিতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করেন। কিন্তু নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, অ্যাম্বুলেন্সে করে রামেক হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আকাশ।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি পরিবারের অমতে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন আকাশ। জীবনের নতুন অধ্যায় সাজাতে সতীহাট এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস শুরু করেছিলেন। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে সুখের একটি সংসার গড়ার সব স্বপ্ন এক নিমেষেই চুরমার হয়ে গেল মহাসড়কের নির্মম ঘাতক চাকার নিচে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টায় জানাজা শেষে অশ্রুসিক্ত নয়নে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। আকাশের এই আকস্মিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।
সন্তানহারা পিতা আশরাফুল ইসলাম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। আকাশ সতীহাট বাজারে ‘দিগন্ত ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড টেলিকম’-এ ডেলিভারি ম্যান হিসেবে কাজ করতো। একটা সড়ক দুর্ঘটনা আমার ছেলেটাকে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে কেড়ে নিল। আমাদের সব শেষ হয়ে গেল।”
এ বিষয়ে মান্দা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) খোরশেদ আলম জানান, বিষয়টি সম্পর্কে থানা পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত অবগত নয়। তবে নিহতের অসহায় পরিবারটি যদি থানায় যোগাযোগ করে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে, তবে বিআরটিএ থেকে সরকারি আর্থিক অনুদান পাওয়ার আইনি সুযোগ থাকবে। এ জন্য হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও আরটিএ (রোড ট্রাফিক অ্যাক্সিডেন্ট) সনদের প্রয়োজন হবে। স্থানীয়রা আশা করছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারটিকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।