নওগাঁ প্রতিনিধিঃ
নওগাঁর মান্দা উপজেলার চৌবাড়িয়া বাজারে উচ্চ আদালতের ডিক্রিপ্রাপ্ত পৈতৃক সম্পত্তিতে নির্মিত ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ওপর সুপরিকল্পিত হামলা, ভাঙচুর ও নজিরবিহীন লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের উসকানি দিয়ে এই তাণ্ডব চালানো এবং প্রায় ২৪ লাখ টাকার ব্যবসায়িক মালামাল লুট করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় একটি স্বার্থান্বেষী মহল ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
সম্প্রতি লাঠিসোটা নিয়ে শিক্ষার্থীদের টিনশেড দোকানে তাণ্ডব চালানোর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সচেতন মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগী পরিবার ও মামলা সূত্রে জানা যায়, মান্দা উপজেলার ভারশোঁ ইউনিয়নের হোসেনপুর গ্রামের বেলাল উদ্দীন ও হোসেন আলী পৈতৃক সূত্রে চৌবাড়িয়া বাজারের ওই ২০ শতাংশ জমির প্রকৃত মালিক (মামলা নং- নওগাঁ জেলা জজ আদালত ৮১/২০২৩)। দীর্ঘদিন ধরে জমিটি দখলের পাঁয়তারা করছিল চৌবাড়িয়া-মালশিরা উচ্চবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। জমির মালিকানা নিশ্চিতে বেলাল উদ্দীন গং বিচারবিভাগের শরণাপন্ন হলে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৬ সালের মে মাসে আদালত বেলাল উদ্দীন ও তাঁর পরিবারের অনুকূলে ডিক্রি (রায়) প্রদান করেন।
উচ্চ আদালতের রায়ের অনেক আগে থেকেই সেখানে বেলাল উদ্দীনের একটি ঘর বিদ্যমান ছিল। পরবর্তীতে আদালতের রায়ের পর গত ২১ আগস্ট (শুক্রবার) সেই ঘরটি মেরামত করা হয় এবং নতুন করে দুটি টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়। সেখানে ৩ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত টিনশেড ঘরে পশুখাদ্য (ফিড), চাল, খুদ ও ভুসিসহ বিপুল পরিমাণ মালামাল রেখে ব্যবসা শুরু করেন তারা।
ভুক্তভোগী বেলাল হোসেন (পিতা: আব্দুল মন্ডল) অভিযোগ করে জানান, আদালতের রায় মেনে বৈধ জমিতে দোকান নির্মাণ করে ব্যবসা পরিচালনা করা হলেও তা মেনে নিতে পারেনি স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল। গত ২৩ আগস্ট (রোববার) সকাল ৮টার দিকে এক ট্রাক (২২ টন) নারিশ ফিড দোকানে আনলোড করা হয়েছিল। কিন্তু ওই দিনই সকাল সাড়ে ১০টার দিকে মালশিরা গ্রামের কিছু চিহ্নিত ব্যক্তি এবং বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কফিল উদ্দিন যৌথভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন।
অভিযোগ রয়েছে, মিলন, সুলতান, মোজাম্মেল, কফিল উদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান, হিমেল, রুবেল, আকাশ, শহিদুল, মোয়াজ্জেমসহ একটি কুচক্রী মহল বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্ররোচিত ও উসকানি দেয়। তারা শিক্ষার্থীদের হাতে লাঠিসোটা তুলে দিয়ে বেলাল উদ্দীনের ৩টি দোকানঘরে একযোগে সুপরিকল্পিত হামলা ও তাণ্ডব চালায়। ভিডিওচিত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা দোকানের টিন ও অবকাঠামো ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে।
হামলাকারীরা শুধু দোকান ভাঙচুর করেই ক্ষান্ত হয়নি, ১২-১৫ জনের অধিক লোক ভ্যান ও মাথায় করে দোকানে থাকা বিপুল পরিমাণ মালামাল লুটপাট করে নিয়ে যায়। এতে ১৬ লক্ষাধিক টাকার মালামাল ও নগদ ৫ লক্ষাধিক টাকাসহ প্রায় ২৪ লাখ টাকার ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে বলে ভুক্তভোগী পরিবার দাবি করেছে।
হামলার সময় দোকানে উপস্থিত বেলাল হোসেনের বৃদ্ধ বাবা-মাকে রড ও লাঠি দিয়ে মারধর করা হয় এবং তার মাকে পার্শ্ববর্তী একটি নোংরা পরিত্যক্ত জায়গায় ফেলে রাখা হয়। পরবর্তীতে বেলাল হোসেন ঘটনাস্থলে পৌঁছে মোবাইলে ভিডিও ধারণ করার চেষ্টা করলে উসকানিদাতা মিলন তাকে রড দিয়ে আঘাত করে। হামলায় গুরুতর আহত বেলালের বাবা-মাকে উদ্ধার করে মান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয় । বেলালের দাবি, ওই জমিতে আগে স্কুলের কোনো দেয়াল ছিল না, কেবল কিছু ভাঙা এলোমেলো ইট পড়ে ছিল।
ভুক্তভোগী বেলাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা আদালতের রায় পেয়েই নিজেদের পৈতৃক জমিতে ব্যবসা করছিলাম। ঘটনার দিন সকালে এক ট্রাক ফিড দোকানে নামানো হয়েছিল। কিন্তু বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি স্কুলের নিষ্পাপ ছাত্রদের ব্যবহার করে আমাদের ধ্বংস করে দিয়েছে। আমাদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে মারধর করা হয়েছে এবং ২৪ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নিঃস্ব করে দেওয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শী সবাই ঘটনাটি জানে।”
ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবার মান্দা থানা পুলিশের শরণাপন্ন হলে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বিষয়টি সমাধানের লক্ষ্যে উভয় পক্ষকে থানায় ডেকে বৈঠকের আহ্বান জানান। কিন্তু অভিযুক্ত পক্ষ সেই আহ্বান উপেক্ষা করায় এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা হয়নি। অপরদিকে, স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে মান্দা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আলিফ উদ্দিন জানান, দোকানঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনাটি পুলিশ পর্যবেক্ষণ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলেই দ্রুত তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।