নওগাঁ প্রতিনিধিঃ
নওগাঁর মান্দায় চকউলী বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাময়িক বরখাস্ত অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিধিবহির্ভূত নিয়োগ, তথ্য গোপন করে এমপিও সুবিধা গ্রহণ, নিয়োগের নামে অর্থ আদায় এবং প্রতিষ্ঠানের তহবিলের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) তদন্ত প্রতিবেদনে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমপিওভুক্তির তথ্য গোপন করে সরকারি বেতন-ভাতা বাবদ নজরুল ইসলাম ৫৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫১ টাকা গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া আরও ১ লাখ ২০ হাজার ৮০৭ টাকা ফেরতযোগ্য বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
প্রতিবেদনে সরকারি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ ফেরত নেওয়াসহ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন সামনে আসার পর অধ্যক্ষকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবিতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা বিক্ষোভ করেছেন।
প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির সভাপতি আবদুল মান্নানের অভিযোগের পর বিষয়টি তদন্ত করে ডিআইএ। শিক্ষা পরিদর্শক মকবুলার রহমান ও অডিটর সিরাজুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি তদন্ত শেষে প্রতিবেদন জমা দেয়।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০২ সালের ১ আগস্ট নজরুল ইসলাম বিধিবহির্ভূতভাবে সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ নেন। পরে তিনি প্রধান শিক্ষক পদে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার নিয়োগ ও এমপিওভুক্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনিয়মের তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এমপিওভুক্তির তথ্য গোপন করে সরকারি বেতন-ভাতা বাবদ তিনি ৫৯ লাখ ৯৪ হাজার ৫১ টাকা গ্রহণ করেছেন। এ ছাড়া আরও ১ লাখ ২০ হাজার ৮০৭ টাকা ফেরতযোগ্য বলে মত দিয়েছে তদন্ত কমিটি।
শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের নামে প্রায় ৭০ লাখ টাকা ‘ডোনেশন’ হিসেবে নেওয়ার অভিযোগও তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। চারজন শিক্ষকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও তাদের মধ্যে তিনজনের টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
তদন্ত প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করা বিভিন্ন ফি এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বিক্রির অর্থ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার ফি, সেশন চার্জ, বেতন ও কোচিং ফি বাবদ আদায় করা অর্থ ব্যাংকে জমা না দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি গভর্নিং বডির অনুমোদন ছাড়াই বিভিন্ন তহবিল থেকে অর্থ উত্তোলনের বিষয়টিও তদন্তে উঠে এসেছে।
প্রতিষ্ঠানের পুকুর ইজারা, পুরোনো আসবাবপত্র এবং আমসহ বিভিন্ন গাছ বিক্রি বাবদ পাওয়া ১০ লাখ ৯৫ হাজার টাকা প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা না দেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব ঘটনায় সরকারি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ ফেরত নেওয়া এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
অধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে গত ৫ আগস্টের পর থেকে বিভিন্ন অজুহাতে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কলেজে নিয়মিত উপস্থিত না থেকেও তিনি ইএফটির (ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার) মাধ্যমে সরকারি বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন।
এ বিষয়ে তাকে একাধিকবার কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হলেও সন্তোষজনক জবাব পাওয়া যায়নি বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী বলেন, প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকলে শিক্ষা কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ে। বিষয়টির দ্রুত প্রশাসনিক সমাধান প্রয়োজন।
অধ্যক্ষ সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন আশরাফুল ইসলাম। শিক্ষা কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখা এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ফলাফল সন্তোষজনক রাখার লক্ষ্যে শিক্ষক-কর্মচারীরা কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এডহক কমিটির সভাপতি আবদুল মান্নান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আশরাফুল ইসলাম, শিক্ষক প্রতিনিধি আজাহারুল ইসলাম কাজল এবং অভিভাবক সদস্য দেলোয়ার হোসেনসহ সংশ্লিষ্টরা প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সচল রাখতে দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রতিষ্ঠানটিতে ২৮ জন শিক্ষক-কর্মচারী ও প্রায় ৪০০ শিক্ষার্থী রয়েছে। শিক্ষার পরিবেশ ও প্রতিষ্ঠানের সুনাম বজায় রাখতে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনে অধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য উঠে আসার পর তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
গত শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে উপজেলার কাঁশোপাড়া ইউনিয়নের চকউলী বহুমুখী স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয় এলাকাবাসীর উদ্যোগে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
সমাবেশে স্থানীয় রোস্তম আলী, এমদাদুল হক, দেলোয়ার হোসেন, ময়েজ উদ্দিন, মামুনুর রশিদ, গিয়াস উদ্দিন, সাইফুল ইসলাম ও শাহাদত হোসেনসহ শিক্ষার্থী-অভিভাবকরা অংশ নেন।
বক্তারা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে ধরেন। তাদের দাবি, তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা বিষয়গুলো যথাযথভাবে নিষ্পত্তি করে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
সমাবেশ থেকে অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলামকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, সরকারি ও প্রতিষ্ঠানের অর্থ ফেরত নেওয়া এবং অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে অধ্যক্ষ মো. নজরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।