• মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:৩১ অপরাহ্ন
শিরোনাম:
রাণীনগরে নানা আয়োজনে জাতীয় যুব দিবস পালিত ফুলবাড়ীতে রাজমিস্ত্রি রুহুল আমিন হত্যার বিচারের দাবিতে লাশ সামনে রেখে মানববন্ধন।। সৌদি আরবে অগ্নিকাণ্ডে নিহত নওগাঁর ৫ প্রবাসীর মরদেহ দাফন নওগাঁর মান্দায় ভালাইন ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আবুল কালাম আজাদের ব্যাপক গণসংযোগ রাজশাহীতে ডিবির অভিযানে পালিয়েছে কুখ্যাত মাদক কারবারী মাসুম ভারতীয় সিরাপসহ প্রাইভেট কার জব্দ, গ্রেপ্তার ১২ রাজশাহীতে পথকুকুরের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন কাজল রেখা রাজশাহীতে ৫২ কেজি গাঁজাসহ তিন মাদক কারবারী গ্রেপ্তার বাঘায় বৃদ্ধাকে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ, ২২ বছরের নারীকে কিশোরী দেখিয়ে থানা থেকে ছাড়ার দাবি রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতে এগিয়ে মেয়েরা, ৩৯ কলেজে কেউ পাস করেনি নওগাঁর মান্দায় এমপির সঙ্গে প্রসাদপুর দলিল লেখক সমিতির নতুন কমিটির শুভেচ্ছা বিনিময়

খাল পুনঃখনন: উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

দিনকাল বিডি ২৪ / ২৪২ Time View
প্রকাশঃ সোমবার, ১৬ মার্চ, ২০২৬

বিজয় কুমার বিশেষ প্রতিনিধি :

বাংলাদেশ নদী ও খালবেষ্টিত একটি দেশ। একসময় এসব খাল ছিল কৃষি সেচ,নৌ-পরিবহন ও
প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশনের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।কিন্তু নগরায়ণ,শিল্পায়ন আর অপরিকল্পিত
উন্নয়নের ফলে কালের বিবর্তনে খালগুলো আজ মৃতপ্রায়। দখল হয়ে গেছে,ভরাট হয়ে গেছে।এমন
বাস্তবতায় সরকার দেশজুড়ে খাল পুনঃখননের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা শুধু একটি সাধারণ উন্নয়ন
কর্মসূচি নয়; এটি গ্রামীণ অর্থনীতির চাকা সচল করার এক মহাপরিকল্পনা।
সোমবার (১৬ মার্চ) দুপুর ১২টার দিকে উপজেলার বলরামপুরের সাহাপাড়া খাল খননের মাধ্যমে এই
প্রকল্প উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী
আগামী পাঁচ বছরে সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, নালা, খাল ও জলাধার খনন ও পুনঃখননের
পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রথম পর্যায়ে দেশের ৫৪টি স্থানে এ
কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এই প্রকল্প জলাবদ্ধতা নিরসন, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কৃষি উৎপাদন
বাড়াতে সহায়ক হবে ।
একসময় গ্রামবাংলার জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি অনেকটাই এই খালগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল।
কৃষকরা খালের পানির মাধ্যমে জমিতে সেচ দিতেন, ছোট নৌযানে পণ্য পরিবহন হতো সহজে, আর
বর্ষার অতিরিক্ত পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ফলে জলাবদ্ধতার সমস্যাও তুলনামূলক কম ছিল। ফলে খাল
শুধু একটি জলধারা নয়,বরং গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে
কাজ করত।

কিন্তু নগরায়ণ,শিল্পায়ন এবং অপরিকল্পিত উন্নয়নের ফলে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব খাল ধীরে
ধীরে হারিয়ে যেতে বসেছে। অনেক খাল দখল হয়ে গেছে, কোথাও ভরাট হয়ে গেছে,আবার কোথাও
আবর্জনা ও পলিতে ভরে কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে পড়েছে। এর ফল হিসেবে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা
বেড়েছে,কৃষিতে সেচ সংকট দেখা দিয়েছে এবং পরিবেশগত ভারসাম্যও বিঘ্নিত হচ্ছে। বিশেষ করে শহর
ও গ্রাম উভয় জায়গাতেই খাল হারিয়ে যাওয়ার কারণে প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের স্বাভাবিক ব্যবস্থা
বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এমন বাস্তবতায় সরকার দেশজুড়ে খাল পুনঃখননের যে উদ্যোগ নিয়েছে,তা নিঃসন্দেহে একটি
সময়োপযোগী পদক্ষেপ।প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পরিকল্পনা অনুযায়ী খাল সমূহ শ্রমিকদের
মাধ্যমে খনন করা হবে। শ্রমিকদের দিয়ে খাল খনন করলে স্থানীয় অনেক বেকার মানুষের কাজের
সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে গ্রামের দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ সাময়িক হলেও আয়ের সুযোগ পাবে, যা
তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে সহায়তা করবে।এবং যখন শ্রমিকরা কাজের মাধ্যমে আয়
করবে, তখন সেই অর্থ স্থানীয় বাজারে ব্যয় হবে। ফলে গ্রামীণ অর্থনীতি সচল হবে এবং ছোট
ব্যবসা-বাণিজ্যও লাভবান হবে।
খাল পুনঃখননের ফলে পানি প্রবাহ স্বাভাবিক হবে এবং কৃষকরা সহজে সেচের পানি পাবে। এতে কৃষি
উৎপাদন বাড়তে পারে এবং কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও কিছুটা কমবে।খাল পুনঃখননের ফলে খালগুলোর
পানিধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং পানি প্রবাহ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে। দীর্ঘদিন পলি
জমে বা ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে অনেক খালে পানি ঠিকভাবে প্রবাহিত হতে পারে না। ফলে কৃষকেরা
সেচের পানির জন্য প্রায়ই সংকটে পড়েন। কিন্তু খালগুলো পুনঃখনন করা হলে সেগুলোতে পর্যাপ্ত
পানি সংরক্ষণ সম্ভব হবে এবং সেই পানি সহজেই আশপাশের কৃষিজমিতে সেচের কাজে ব্যবহার করা
যাবে।
এর ফলে কৃষকদের সেচের জন্য গভীর নলকূপ বা ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরতা অনেকটা কমে
যাবে। এতে একদিকে যেমন সেচের খরচ কমবে,অন্যদিকে কৃষিকাজও আরও সহজ ও লাভজনক
হবে।পর্যাপ্ত সেচ সুবিধা থাকলে জমিতে সময়মতো চাষাবাদ করা সম্ভব হবে এবং ফসলের
উৎপাদনও বৃদ্ধি পাবে।ফলে খাল পুনঃখনন শুধু পানির প্রবাহ স্বাভাবিক করেই থেমে থাকে না,বরং
এটি কৃষি উৎপাদন বাড়ানো এবং কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখতে পারে।
খাল পুনঃখননের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাবে। অথাৎ খাল পুনরুদ্ধার বা পুনঃখননের ফলে
প্রাকৃতিক পানি প্রবাহ আবার স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।দীর্ঘদিন ধরে পলি জমা,দখল কিংবা ভরাট হয়ে
যাওয়ার কারণে অনেক খাল তাদের স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়েছে। যখন এসব খাল পুনরায় খনন করা
হয়,তখন বৃষ্টির পানি সহজে প্রবাহিত হতে পারে এবং আশপাশের জলাভূমি ও নদীর সঙ্গে সংযোগও
পুনঃস্থাপিত হয়। এতে প্রাকৃতিক জলচক্র স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারে।

এছাড়া খালগুলোতে পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বাড়লে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও কিছুটা স্থিতিশীল থাকে।
কারণ খালের পানি ধীরে ধীরে মাটির নিচে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ পানির ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে। এর
ফলে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে যে সংকট তৈরি হয়,তা কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব
হয়।
অন্যদিকে খাল পুনরুদ্ধার পরিবেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। খাল ও
জলাশয়গুলো মাছ, জলজ উদ্ভিদ এবং বিভিন্ন প্রাণীর জন্য স্বাভাবিক আবাসস্থল হিসেবে কাজ
করে।ফলে খাল পুনঃখননের মাধ্যমে শুধু পানি প্রবাহই স্বাভাবিক হয় না,বরং সামগ্রিকভাবে
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং একটি সুস্থ প্রাকৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ
অবদান রাখতে পারে।
খাল পুনঃখননের ফলে জলাবদ্ধতা কমে যাবে।অথাৎ খালগুলো পরিষ্কার ও গভীর করা হলে বর্ষার
অতিরিক্ত পানি সহজে প্রবাহিত হয়ে নদী বা বড় জলাশয়ে চলে যেতে পারে। সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে
খালগুলোতে পলি জমা, ময়লা-আবর্জনা কিংবা দখলের কারণে পানির স্বাভাবিক চলাচল বাধাগ্রস্ত
হয়। ফলে বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি দ্রুত বের হতে পারে না এবং আশপাশের এলাকা
পানিতে তলিয়ে গিয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
কিন্তু খাল পুনঃখননের মাধ্যমে যখন এসব খাল পরিষ্কার ও গভীর করা হয়,তখন পানি প্রবাহের পথ
উন্মুক্ত হয়ে যায়।এতে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে এবং শহর ও গ্রামের
রাস্তাঘাট,বসতবাড়ি ও কৃষিজমিতে পানি জমে থাকার সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। বিশেষ করে নগর
এলাকাগুলোতে যেখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অনেক সময় অপর্যাপ্ত,সেখানে খালগুলো প্রাকৃতিক
নিষ্কাশন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে।
এভাবে খাল পুনরুদ্ধার করলে বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার কষ্ট কমবে,মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা
ব্যাহত হবে না এবং কৃষিজমির ফসলও পানির ক্ষতি থেকে অনেকটাই রক্ষা পাবে। ফলে খাল পুনঃখনন
জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি কার্যকর ও টেকসই সমাধান হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
খাল খননের পথে প্রধান বাধাগুলো হলো দখল ।অনেক খাল আজকাল ব্যক্তিগত বা বেসরকারি জমি
হিসেবে দখল হয়ে গেছে। কেউ হয়তো নিজের বাড়ি,কৃষিজমি বা দোকান সম্প্রসারণের জন্য খালের অংশ
দখল করেছে। দখল হওয়া খালে পানি প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়,খালের প্রকৃতির সঙ্গে থাকা জলজ
উদ্ভিদ ও প্রাণীর বসবাসও বিঘ্নিত হয়। ফলে খাল খনন বা পুনঃখননের জন্য এই দখলকৃত জমি
থেকে পানি বের করা ও খাল পুনরুদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া এই
দখলমুক্তকরণও সহজ নয়।
পরিশেষে বলা যায়,খাল পুনঃখননের মাধ্যমে কৃষি ও পরিবেশে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। একদিকে
কৃষকের মুখে হাসি ফুটেছে,অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পথ সুগম হয়েছে। তবে এখানেই কাজ
শেষ নয়। খাল খননের পর দখল ও দূষণ রোধ করতে না পারলে এই আশার আলো নিভে যেতে পারে। তাই
শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কৃষক ও সুশীল সমাজকে মিলিতভাবে

খালগুলোর তদারকি করতে হবে। তবেই খাল পুনঃখনন সত্যিকার অর্থেই কৃষি ও পরিবেশের জন্য
একটি টেকসই ও ফলপ্রসূ বার্তা হয়ে থাকবে।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category