নওগাঁ প্রতিনিধি,
অবশেষে অপসারিত হলেন নওগাঁর মান্দা থানার বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম মাসুদ রানা। জামায়াত ঘরানার পারিবারিক পরিচয় গোপন করে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ওঠা পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগে শেষ রক্ষা হলো না।
৩১ মার্চ (মঙ্গলবার) নওগাঁ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নওগাঁ পুলিশ লাইন্স ও.আর-হেডকোয়ার্টারে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই আদেশে মান্দা থানার নতুন অফিসার ইনচার্জ হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে নওগাঁ সদর মডেল থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোঃ খোরশেদ আলমকে। বিতর্কিত এই ওসির অপসারণের খবরে বুধবার বিকেলে মান্দার বিভিন্ন হাট-বাজারে সাধারণ মানুষের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালে এসআই হিসেবে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেওয়া পাবনার সুজানগর উপজেলার বাসিন্দা মাসুদ রানার উত্থান ছিল রূপকথার মতো। তার শ্বশুর ও পিতা সরাসরি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকলেও কৌশলে নিজেকে আওয়ামী লীগের আশীর্বাদপুষ্ট হিসেবে জাহির করতেন তিনি। মাত্র ১৪ বছরের চাকরিতেই বগুড়া শহরের অভিজাত এলাকায় গড়ে তুলেছেন একাধিক প্লট ও বিলাসবহুল সম্পদ, যার বর্তমান বাজারমূল্য ১০ কোটি টাকারও বেশি। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে থাকাকালীন জব্দকৃত ট্রাক থেকে ২৩ লাখ টাকার পাম অয়েল ‘গায়েব’ করে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মান্দা থানায় যোগদানের পর থেকেই মাসুদ রানার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। সম্প্রতি দক্ষিণ মৈনম হিন্দু পল্লীতে গভীর রাতে তেলের মজুত খোঁজার অজুহাতে ওসির নেতৃত্বে পুলিশের ভয়াবহ তাণ্ডবে এলাকায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া গত ২৯ মার্চ শাপলা ফিলিং স্টেশনে তেল কালোবাজারিতে মদদ দেওয়ার অভিযোগে তিনি জনতার তোপের মুখে পড়েন। ওসির বিরুদ্ধে সবচেয়ে ভয়ংকর অভিযোগ হলো প্রসাদপুর কওমি মাদ্রাসার ছাত্র হত্যার ঘটনায় মোটা অঙ্কের বিনিময়ে মূল ঘাতককে মামলা থেকে বাদ দেওয়া। এর আগে গত ৭ মার্চ শ্রীরামপুর গ্রামে এক পরিবারের ওপর হামলার সময় ভুক্তভোগীরা জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ বারবার কল দিলেও ওসির নির্দেশে পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়নি বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে থানায় অভিযোগ করতে গেলে উল্টো ‘চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসানোর’ হুমকির একটি অডিও ক্লিপ ভাইরাল হয়।
বিতর্কিত এই ওসির অপসারণের খবরে মান্দার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, শুধু ক্লোজড নয়, তার অবৈধ সম্পদের তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য অপসারিত ওসি কে এম মাসুদ রানা বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। সম্পদের যে কথা বলা হচ্ছে, তা আমার বৈধ আয়ের ও পৈতৃক সূত্রে পাওয়া। পুলিশ লাইন্সে সংযুক্তির বিষয়টি প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার অংশ, এর সাথে অভিযোগের কোনো সম্পর্ক নেই।’
এ বিষয়ে নওগাঁর পুলিশ প্রশাসন জানায়, জনস্বার্থে এবং প্রশাসনিক গতিশীলতা বজায় রাখতেই এই রদবদল করা হয়েছে। তবে ভুক্তভোগীদের দাবি— শুধু ক্লোজড নয়, তার অবৈধ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।