বিজয় কুমার বিশেষ প্রতিনিধি :
প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আগে যদি একজন শিক্ষককে ভাবতে হয় পরিবারের ভরণপোষণের খরচ জোগাড়ের উপায় নিয়ে, যদি তাকে চিন্তা করতে হয় সন্তানের পড়ালেখার খরচ কিংবা পরিবারের চিকিৎসার বিলের কথা, তবে সেই শিক্ষকের পক্ষে ক্লাসরুমে গিয়ে উৎসাহ ও প্রাণবন্ততা নিয়ে পড়ানো কতটা সম্ভব? একজন শিক্ষকের মন ও মনন যখন আর্থিক দুশ্চিন্তায় আক্রান্ত হয়, তখন তা পুরো শ্রেণিকক্ষের পরিবেশকে বিষাদে আচ্ছন্ন করে ফেলে। তাই, শিক্ষার্থীদের মনের জগতকে আলোকিত করতে চাইলে, আগে শিক্ষকের জীবনকে আর্থিক অন্ধকার থেকে মুক্ত করতে হবে।
গুণগত শিক্ষা বলতে আমরা বুঝি জ্ঞানার্জন, চিন্তনশীলতা বিকাশ এবং মৌলিক দক্ষতা অর্জনের একটি কার্যকর প্রক্রিয়াকে। শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের আলোচনায় প্রায়শই পাঠ্যক্রম উন্নয়ন, প্রযুক্তির সংযোজন বা অবকাঠামোগত পরিবর্তনের উপর জোর দেওয়া হয়। কিন্তু একটি মৌলিক ও অত্যাবশ্যকীয় বিষয় প্রায়ই উপেক্ষিত থেকে যায়, তা হল শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা। শিক্ষকরা যখন দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো, ঋণের বোঝা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা নিয়ে সংগ্রাম করেন, তখন তাদের পক্ষে শ্রেণিকক্ষে সৃজনশীলতা ও নিষ্ঠার সাথে শিক্ষাদান করা কঠিন হয়ে পড়ে।তাই শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা এই কারণেই গুণগত শিক্ষার একটি অপরিহার্য পূর্বশর্ত, কোনো বিকল্প নয়।
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা শুধু ব্যক্তি জীবনে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং এটি পুরো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, কার্যক্রম এবং শিক্ষার গুণগত মানকে ধ্বংসাত্মকভাবে প্রভাবিত করে।
আর্থিক অনিশ্চয়তা শিক্ষকের ব্যক্তিগত জীবনকে চরম মানসিক চাপে ফেলে। এই চাপ ক্লাসরুমে তার ধৈর্য, সৃজনশীলতা এবং শিক্ষাদানের উদ্যমকে নষ্ট করে দেয়। যখন একজন শিক্ষক পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে চিন্তিত থাকেন, তখন তিনি শ্রেণিকক্ষে পুরোপুরি মনোযোগ দিতে পারেন না। এর ফলে তার মধ্যে কাজের প্রতি অনীহা এবং হতাশা তৈরি হয়। যে শিক্ষক মানসিকভাবে স্থিতিশীল নন, তিনি শেখানোর নতুন পদ্ধতি তৈরি করতে, শিক্ষার্থীর দুর্বলতা চিনতে বা অতিরিক্ত সময় দিতে পারেন না।
আবার,যখন একজন শিক্ষক পর্যাপ্ত বেতন না পেয়ে আর্থিক সংকটে ভোগেন, তখন তাকে বাধ্য হয়ে টিউশনি,কোচিং বা অন্য কোনো অতিরিক্ত আয়ের পথ খুঁজতে হয়। এর ফলে তাঁর দিনের স্বাভাবিক রুটিন বিঘ্নিত হয় এবং বিদ্যালয়ে সঠিক সময়ে উপস্থিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত আয়ের কাজে সময় ব্যয় করতে গিয়ে শিক্ষক বিদ্যালয়ে সঠিকভাবে পাঠদান করতে পারে না। এতে করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার সুষ্টু পরিবেশ নষ্ট হয়। শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তার অভাব তাঁদের সময়ানুবর্তিতা ও উপস্থিতির ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে, যা বিদ্যালয়ের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়।
শিক্ষকতা একসময় সমাজে সর্বোচ্চ সম্মানিত পেশাগুলোর একটি ছিল। কিন্তু বর্তমানে নানা কাঠামোগত ও আর্থিক সমস্যার কারণে এই পেশার প্রতি মেধাবী তরুণ–তরুণীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। মেধাবী মানুষ সাধারণত এমন পেশায় যেতে চান যেখানে আর্থিক স্থিতি নিশ্চিত। কিন্তু শিক্ষকতার বেতন তুলনামূলকভাবে কম, ভাতা সীমিত এবং চাকরির শুরুতেই আর্থিক সুবিধা অন্য পেশার মতো আকর্ষণীয় নয়। ফলে তারা ব্যাংক, কর্পোরেট সেক্টর, আইসিটি বা সরকারি উচ্চ গ্রেডের চাকরি বেছে নেয়।
আবার শিক্ষকতা পেশায় পদোন্নতির সুযোগ তুলনামূলক কম এবং ধীরগতি। অনেক শিক্ষক বছরের পর বছর একই পদের দায়িত্ব পালন করেন। আর্থিক বা পেশাগত উন্নয়ন খুব ধীরে আসে। ফলে এই পেশা তরুণদের কাছে অনুৎসাহজনক মনে হয়। আবার যারা আছেন তারাও পেশা পরিবর্তনের কথা ভাবেন। ফলে ভালো শিক্ষক পাওয়া কঠিন হয়। অনেক বিদ্যালয় অভিজ্ঞ শিক্ষক হারায়। শিক্ষক স্থির থাকলে শিক্ষা উন্নত হয়, আর শিক্ষক অস্থির থাকলে শিক্ষা ধ্বংস হয়।
শিক্ষকদের আর্থিক নিরাপত্তা অনেক পেশার তুলনায় দুর্বল। শিক্ষকতার মতো গুরুত্বপূর্ণ পেশায় আর্থিক নিরাপত্তার ঘাটতি তরুণদের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলে। কারণ কোনো পেশা বেছে নেওয়ার সময় মানুষ তার বর্তমান জীবনযাপন এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা—দুটিকেই সমান গুরুত্ব দেয়। শিক্ষকতা পেশায় এই দুই ক্ষেত্রেই অনিশ্চয়তা বেশি থাকায় অনেক মেধাবী তরুণ এতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
শিক্ষকদের আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা শুধু তাদের ব্যক্তিগত কল্যাণের জন্য নয়, বরং শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক মানোন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। একজন আর্থিকভাবে নিরাপদ শিক্ষক আরও আত্মবিশ্বাসী, মনোযোগী ও সৃজনশীলভাবে কাজ করতে পারেন। তাই শিক্ষকতা পেশাকে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করতে কয়েকটি মৌলিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
বেতন কাঠামোর উন্নয়ন ও নিয়মিত বেতন বৃদ্ধি করতে হবে। বর্তমান বেতন কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয় অনুযায়ী পর্যাপ্ত নয়। জীবনযাত্রার ব্যয়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেতন পুনর্নির্ধারণ করা প্রয়োজন।নির্দিষ্ট সময় পর পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখতে হবে। এতে শিক্ষকেরা আর্থিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত থাকবেন।
চিকিৎসা সুবিধা ও স্বাস্থ্যবীমা চালু করতে হবে। শিক্ষকদের জন্য সরকারি বা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক স্বাস্থ্যবীমা অত্যন্ত জরুরি।পরিবারসহ চিকিৎসা ব্যয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মতো বীমা সুবিধা চালু করা উচিত।বার্ষিক চিকিৎসা ভাতা ও জরুরি চিকিৎসার জন্য বিশেষ তহবিল করা যেতে পারে।এতে চিকিৎসাজনিত আর্থিক চাপ অনেকটাই কমবে।
আবাসন সুবিধা বা ভর্তুকি বৃদ্ধি করতে হবে। বড় শহরগুলোতে উচ্চ ভাড়ার কারণে শিক্ষকরা আর্থিক চাপের মধ্যে থাকেন। সরকারি আবাসন প্রকল্পে শিক্ষকদের জন্য কোটার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বাড়ি ভাড়ার জন্য বিশেষ ভাতা প্রদান করা উচিত।এতে মাসিক ব্যয় অনেক সহজে সামলানো যাবে।
অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। যেসব শিক্ষক বিশেষ প্রশিক্ষণ দেন, কারিকুলাম ডেভেলপমেন্টে কাজ করেন, বা গবেষণা করেন, তাদের জন্য অতিরিক্ত ভাতা ও প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে তাদের আয়ের উৎস বাড়বে এবং পেশাগত উন্নয়নও হবে।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ তাদের শিক্ষকদের উপর নির্ভর করে। তাই শিক্ষককে যদি সমাজে যথাযথ মর্যাদা ও সম্মান না দেওয়া হয়, তাহলে শিক্ষাখাতে উন্নত হওয়া কঠিন। শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদা বাড়াতে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের গুরুত্বপূর্ণ পেশাজীবী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। গণমাধ্যমে শিক্ষকদের ইতিবাচক অবদান তুলে ধরে সমাজে তাদের ভাবমূর্তি শক্তিশালী করা জরুরি। জাতীয়, জেলা ও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত পুরস্কার ও সম্মাননা দিলে পেশার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি শিক্ষকদের নীতি নির্ধারণী কাজে যুক্ত করা, উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষক-অভিভাবক-শিক্ষার্থী সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক বা অযাচিত হস্তক্ষেপ কমিয়ে শিক্ষকদের পেশাগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করলে সমাজে তাদের সম্মান আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে।
শিক্ষকই শিক্ষার মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু আর্থিক নিরাপত্তা না থাকলে শিক্ষক অপ্রস্তুত ও হতাশ হয়ে পড়েন, যা শিক্ষার্থীর শেখার পরিবেশকে সরাসরি প্রভাবিত করে। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে প্রথমে শিক্ষকের জীবনকে আর্থিক দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত করতে হবে। যখন শিক্ষক আর্থিক চাপমুক্ত থাকেন, তখন তিনি শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জন, চারিত্রিক গঠন ও মানসিক বিকাশে পুরোপুরি সময় দিতে পারেন, যা গুণগত শিক্ষার মৌলিক চাবিকাঠি। শিক্ষকদের আর্থিক সুরক্ষা প্রকৃতপক্ষে শিক্ষার্থীর ভবিষ্যতে বিনিয়োগ। যখন শিক্ষক আর্থিক চাপমুক্ত থাকেন, তখন তিনি শিক্ষার্থীর জ্ঞানার্জন, চারিত্রিক গঠন ও মানসিক বিকাশে পুরোপুরি সময় দিতে পারেন, যা গুণগত শিক্ষার মৌলিক চাবিকাঠি। শিক্ষকের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে গুণগত শিক্ষা অর্জন অসম্ভব।
বিজয় কুমার,
শিক্ষক ও লেখক