বিজয় কুমার,বিশেষ প্রতিনিধি :
গণমাধ্যম একদিকে যেমন তথ্য ও জ্ঞান ছড়িয়ে দেয়, তেমনি ভুল বা পক্ষপাতদুষ্ট তথ্যও মানুষের চিন্তা ও মতামতকে প্রভাবিত করতে পারে। ইন্টারনেটের এই যুগে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু সঠিক তথ্য চিনে নেওয়ার দক্ষতা অনেকেরই নেই। ভুয়া খবর বা ফেক নিউজ, ভুল ব্যাখ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রথম ও প্রধান উপায় হচ্ছে মিডিয়া লিটারেসি। মিডিয়া লিটারেসি আমাদের শেখায় কিভাবে তথ্য বিশ্লেষণ করতে হয়, নির্ভরযোগ্য উৎস চেনা যায় এবং ভুল তথ্য থেকে নিজেকে রক্ষা করা যায়।
প্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের দ্রুত বিকাশের ফলে এখন প্রায় সব মানুষই নানা মাধ্যমে থেকে প্রচুর তথ্য পাচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে খবর মুহূর্তেই ভাইরাল হয়, কিন্তু এর সঙ্গে সমানতালে বাড়ছে ভুল তথ্য বা মিথ্যা তথ্য এবং ক্ষতিকর তথ্য এর বিস্তার। ফেক নিউজ শুধু বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করে না, এটি সামাজিক অস্থিরতা, রাজনৈতিক উত্তেজনা,এমনকি অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতারও কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
মিডিয়া লিটারেসি বা গণমাধ্যম সাক্ষরতা হলো তথ্য বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন ও ব্যবহারের দক্ষতা। এটি মানুষকে শেখায় কীভাবে সঠিক সংবাদ এবং ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য পার্থক্য করতে হয়।মিডিয়া লিটারেসির মাধ্যমে কীভাবে তথ্যের উৎস যাচাই করতে হয় ,কোন সংবাদটি নিরপেক্ষ এবং কোনটি পক্ষপাতদুষ্ট, কিভাবে গুজব বা ভুয়া তথ্য শনাক্ত করা যায়, আবার,নিজের মতামত গঠনের আগে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্লেষণ করতে শিখায়।
ফেক নিউজ বা ভুয়া খবর শুধু মিথ্যা তথ্য নয়, এটি একটি সামাজিক বিষবাষ্প যা ধীরে ধীরে সমাজের ভিত্তিকে নষ্ট করে দেয়। এটি শুধু বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে না, বরং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, রাজনৈতিক অস্থিরতা, এমনকি হত্যাকাণ্ডের মতো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনে। মিথ্যা খবর বা তথ্য একটি সাইবার অস্ত্র যা সমাজকে ভিতর থেকে খুন করে।
ফেক নিউজ বা ভুল তথ্যের এই যুগে মিডিয়া লিটারেসি (গণমাধ্যম সাক্ষরতা) একটি জীবন রক্ষাকারী দক্ষতা। কোনো তথ্য বা সংবাদ শেয়ার করার আগে বার বার ভাবুন তথ্যটির উৎস কি বিশ্বস্ত? তথ্যটি কত তারিখের? এবং অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া বা সাইটে একই খবর আছে কি?
আবার, তথ্যটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ফ্যাক্ট-চেকিং টুলস ব্যবহার করুন।অথাৎ গুগল Fact Check Explorer বা Snopes (snopes.com), অথবা FactCheck.org (মিথ্যা খবর যাচাইয়ের জন্য) এবং Reverse Image Search (গুগলে ছবি আপলোড করে দেখুন এটি আগে কোথায় ব্যবহার হয়েছে)।আমাদের উচিএ হবে কোনো গুজব দেখলে প্রথমে যাচাই করুন, তারপর শেয়ার বন্ধ করুন।
আবেগপ্রবণ হয়ে তথ্য শেয়ার করবেন না । ভয়ের, ঘৃণার বা রাগের ওপর ভিত্তি করে কোনো তথ্য শেয়ার করা বিপজ্জনক। এগুলো গুজব ছড়ানোর সহজ মাধ্যম। আগে ভাবুন, তারপর শেয়ার করুন। নিজের পছন্দ বা মতাদর্শের সঙ্গে মিললে কোনো তথ্য অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে, প্রতিপক্ষের দৃষ্টিভঙ্গিও বিবেচনায় আনুন। অথাৎ নিরপেক্ষভাবে যেটা ঘটছে ,সেটা তুলে ধরা।
অনেক সময় শিরোনাম গুজব ছড়ানোর হাতিয়ার হয়। পুরো কনটেন্ট না পড়ে বা যাচাই না করে শুধু শিরোনামের উপর ভিত্তি করে মত গঠন করা উচিত নয়। কিছু কিছু মিডিয়া বা গণমাধ্যম মিথ্যা বা গুজব ছড়ানোর জন্য চাকচিক্য শিরোনাম ব্যবহার করে যা দেখে অনেকে ভেতরে না পড়ে সংবাদ শেয়ার করে থাকে। ফলে ভুল তথ্য সহজে পরিবার ও সমাজে ছড়িয়ে পড়ে।
ভুল তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো একার যুদ্ধ নয়। এটি সমাজের প্রতিটি সদস্যের সম্মিলিত দায়িত্ব। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকার থেকে সামাজিক মাধ্যম—সবাইকে একসাথে এগিয়ে আসতে হবে। কারণ, সত্যিকারের উন্নত জাতি গড়ে উঠে সত্যের ভিত্তিতে, মিথ্যার ধোঁয়াশায় নয়।
ফেক নিউজ বা ভুল তথ্য প্রতিরোধে দরকার সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ববোধ। কোনো কিছু হলে সহজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার না করা,আবার পরিবারে বাচ্চাদের মিডিয়া লিটারেসি শেখানো। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল লিটারেসি কোর্স চালু করা যাতে করে সহজে শিক্ষার্থীরা সঠিক খবরটি জানতে পারে । আবার,সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্বশীল ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে ।
সরকারি পর্যায়ে সাইবার সচেতনতা কর্মসূচি জোরদার করা যাতে করে যেকৈউ মিথ্যা তথ্য ছড়ালে বা ইচ্ছাকৃতভাবে গুজব ছড়ানো বা হেট স্পিচ দেওয়ার জন্য জরিমানা/শাস্তি নিশ্চিত করা যেতে পারে।
তথ্য হলো শক্তি, শুধু সঠিক তথ্যই পারে সমাজকে এগিয়ে নিতে। কিন্তু মিথ্যা বা গুজব একটা ব্যক্তি ,সমাজ বা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে দিতে পারে।ব্যক্তির জীবনে নেমে আসতে পারে কালো অধ্যায় যা থেকে ব্যক্তির জীবন শেষও হয়ে যেতে পারে নিমিষে।একটা সমাজ বা রাষ্ট্রকেও ধ্বংস করে দিতে পারে একটা মিথ্যা বা ভুল তথ্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া খবরের ৬০ শতাংশের বেশি কোনো না কোনোভাবে বিভ্রান্তিকর বা ভুল তথ্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধম্যে বা হোয়াটসঅ্যাপে কোনো পোস্ট শেয়ার করার আগে ৫ মিনিট সময় নিন যাচাই করার জন্য। এক ক্লিকে খবর শেয়ার করার আগে কয়জনই বা ভাবে তথ্যটি কি নির্ভরযোগ্য বা সত্য।
ইন্টারনেটের এই যুগে তথ্যের অভাব নেই, কিন্তু সঠিক তথ্য চিনে নেওয়ার দক্ষতা অনেকেরই নেই। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে,গ্লোবাল স্ট্যাটিস্টা’র মতে, ২০২৩ সালে ৬৮% ইন্টারনেট ব্যবহারী ফেক নিউজের শিকার হয়েছেন।
মিডিয়া লিটারেসি শেখায় যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে এবং বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য গ্রহণ করতে। যদিও প্রতিটি সংবাদ মাধ্যম বা ব্যক্তির কিছু না কিছু পক্ষপাত (Bias) থাকতে পারে।
তবে সত্যকে সত্য বলার বা মেনে নেওয়ার মানসিকতা সবারই থাকতে হবে। একপক্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গি কখনোই সঠিক তথ্য জনগনকে দিতে পারে না।
গুজব, মিথ্যা তথ্য ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা আমাদের সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। তাই মিডিয়া লিটারেসির চর্চা কেবল ব্যক্তি নয়, পুরো সমাজের নিরাপত্তার প্রশ্ন। ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর তথ্য থেকে নিজেকে এবং সমাজকে রক্ষা করতে হলে প্রথম ধাপ হলো মিডিয়া লিটারেসি অর্জন। এটি কেবল একটি শিক্ষাগত দক্ষতা নয়, বরং একটি সামাজিক প্রয়োজন।মিডিয়া লিটারেসির মাধ্যমে আমরা নিজেদের মতো করে চিন্তা করতে শিখি, সত্যের কাছে পৌঁছাতে পারি এবং একটি দায়িত্বশীল সমাজ গড়ার পথে এগিয়ে যেতে পারি।
লেখক: বিজয় কুমার
সাবেক শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।