জুনায়েদ রহমান চন্দন স্টাফ রিপোর্টার :
একটি দেশ কতটা উন্নত হবে, তা নির্ভর করে সে দেশের জনগণের দক্ষতার উপর। বাংলাদেশে লাখ লাখ তরুণ উচ্চশিক্ষা শেষে চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও, তাদের একটি বড় অংশই কর্মহীন থেকে যাচ্ছে। এর অন্যতম কারণ হলো, শিক্ষাজীবনে অর্জিত জ্ঞান বাস্তব জীবনে প্রযোজ্য নয়।
অথচ,যদি তারা দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাভিত্তিক কারিগরি শিক্ষা পেত,তাহলে কর্মসংস্থানের সমস্যা অনেকাংশে কমে হতো। তাই এখন ই সময় কারিগরি শিক্ষার প্রসার ,মান উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতেই হবে।
বর্তমান বিশ্বে দক্ষতা ছাড়া কর্মসংস্থান প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেবল প্রথাগত সাধারণ শিক্ষা দিয়ে জীবন ও জীবিকার চাহিদা পূরণ করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতায় কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম প্রধান মাধ্যম হচ্ছে এই কারিগরি শিক্ষা,যা শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তিকেও করে তোলে সুদৃঢ়।
বাংলাদেশের অর্থনীতি বহুলাংশে শ্রমনির্ভর। কিন্তু এখানকার একটি বড় অংশের শ্রমশক্তি এখনো অপর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া কিংবা ইউরোপীয় দেশগুলোতে যেসব বাংলাদেশি শ্রমিক কাজ করেন, তাদের বড় অংশই অদক্ষ বা স্বল্পদক্ষ। ফলে একদিকে মজুরি কম, অন্যদিকে ঝুঁকি বেশি। অথচ একটু পরিকল্পিত কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণই এই চিত্র পাল্টে দিতে পারে।
২০৩০ সালের মধ্যে ২০% শিক্ষার্থীকে কারিগরি শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে,যা ইতিবাচক উদ্যোগ। পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট,কারিগরি স্কুল ও কলেজের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এখনো সমস্যা রয়েছে মান, শিক্ষকসংকট, অবকাঠামো এবং শিল্পখাতের সাথে বাস্তবিক সংযোগের অভাবে। কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে যেসব শিক্ষার্থী বের হন, তাদের অনেকেই চাকরি পাচ্ছেন না—এটা এক ধরণের আত্মবিরোধী চিত্র। তার মানে, শুধু ডিপ্লোমা বা সার্টিফিকেট নয়, বাস্তব দক্ষতা অর্জনই আসল বিষয়। এজন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী পাঠ্যক্রম, ইন্ডাস্ট্রি–একাডেমিয়া সহযোগিতা, এবং প্রশিক্ষণের শেষে ইন্টার্নশিপ বা প্র্যাকটিক্যাল অ্যাসাইনমেন্ট বাধ্যতামূলক করা।
আবার, নারীদের অংশগ্রহণ কারিগরি শিক্ষায় আশানুরূপ নয়। যদি আমরা নারী কর্মশক্তিকে দক্ষ করে তুলতে পারি, তাহলে তা হবে দেশের জন্য একটি বিশাল অর্জন। পাশাপাশি সমাজে ‘হাতেকলমে কাজ’ কে ছোট করে দেখার মানসিকতাও পরিবর্তন দরকার। শিক্ষা মানেই শুধু অফিসের চাকরি নয়—দক্ষ হস্তশ্রম ও প্রযুক্তি-জ্ঞানভিত্তিক পেশাও সম্মানজনক।
বাংলাদেশে বর্তমানে শিল্পায়নের যে ধারা শুরু হয়েছে, তা সফলভাবে এগিয়ে নিতে দক্ষ কারিগরি জনশক্তির বিকল্প নেই। পাশাপাশি বিদেশে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকদের জন্যও কারিগরি জ্ঞান অপরিহার্য, কারণ দক্ষ শ্রমিকদের চাহিদা সবখানে বেশি এবং তাদের বেতনও তুলনামূলক বেশি।
সরকার ইতোমধ্যে কারিগরি শিক্ষার উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে—নতুন নতুন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন, প্রশিক্ষণ সুবিধা বৃদ্ধি এবং কারিগরি শিক্ষাকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে দেশের তরুণ সমাজকে দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করছে।
কারিগরি শিক্ষা ব্যক্তি বিশেষকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলে। একজন শিক্ষার্থী যখন কোনো একটি নির্দিষ্ট পেশাগত ক্ষেত্রে যেমন: ইলেকট্রিশিয়ান, মেকানিক, প্লাম্বার, কম্পিউটার অপারেটর, গ্রাফিক ডিজাইনার ইত্যাদিতে প্রশিক্ষণ লাভ করে, তখন সে চাকরির পেছনে না ঘুরেও নিজেই কাজ শুরু করতে পারে।
এতে করে তার আয় বৃদ্ধি পায় এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন ঘটে।
দেশে ও বিদেশে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, এবং অন্যান্য উন্নত দেশগুলোতে দক্ষ কারিগরি কর্মীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাংলাদেশের তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণ দিলে তারা এই বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে পারবে।
আবার, সাধারণ শিক্ষার তুলনায় কারিগরি শিক্ষা গ্রহণকারী ব্যক্তিরা সহজে কাজের সুযোগ পান। ফলে দেশের উচ্চ বেকারত্বের হার কমাতে কারিগরি শিক্ষা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। উদ্যোক্তা তৈরি করতে পারে কারিগরি শিক্ষা। কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করে অনেকেই নিজে ব্যবসা শুরু করতে পারেন—যেমন ইলেকট্রিশিয়ান, গাড়ির মেকানিক, ওয়েল্ডার, ওয়েব ডেভেলপার ইত্যাদি। এতে উদ্যোক্তা তৈরির সুযোগ বাড়ছে।
আইটি, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, গ্রাফিক ডিজাইন, এবং অটোমেশন বিষয়ক কারিগরি শিক্ষা বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এসব খাতে দক্ষতা অর্জনকারীরা দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে কারিগরি শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এই খাতে এখনো নানা ধরনের সমস্যা বিদ্যমান।যেমন,পর্যাপ্ত প্রতিষ্ঠান ও অবকাঠামোর অভাব, দক্ষ শিক্ষক সংকট, শিল্প-কারখানার সঙ্গে সংযোগের অভাব, বাজেট ও অর্থায়নের ঘাটতি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা ইত্যাদি।কারিগরি শিক্ষার জন্যে বর্তমানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন, পাঠ্যক্রমকে আধুনিকায়ন করা উচিত, যেন তা প্রযুক্তিনির্ভর এবং বাজারচাহিদাসম্মত হয়, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) বাড়ানো প্রয়োজন। নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে আলাদা সুবিধা বা ইনসেনটিভ থাকা উচিত। কারিগরি শিক্ষার প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন প্রয়োজন—যাতে এটি “দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা” হিসেবে না দেখা হয়।
কারিগরি শিক্ষা একটি জাতির উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এটি শুধু বইভিত্তিক জ্ঞান নয়, বরং বাস্তব জীবনে কাজে লাগানো যায় এমন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়। বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থানের চাপও বাড়ছে। এই চাপ মোকাবিলায় কারিগরি শিক্ষাই হতে পারে কার্যকর সমাধান। দক্ষ জনবল গড়ে তুলে এটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে পারে, বিশেষ করে রপ্তানি আয় এবং শিল্প খাতে। তাই আমাদের উচিত কারিগরি শিক্ষাকে আরও গুরুত্ব দেওয়া, এর প্রসার ঘটানো এবং সমাজে এর মর্যাদা বৃদ্ধি করা। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যদি টেকসই উন্নয়ন ও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে চায়, তবে কারিগরি শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।
লেখক: বিজয় কুমার
সাবেক শিক্ষার্থী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।