নওগাঁ প্রতিনিধিঃ আইনের রক্ষক যখন ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তখন সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায়। নওগাঁর মান্দা থানার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কে এম মাসুদ রানা যেন সেই প্রবাদেরই জীবন্ত উদাহরণ। তার বিরুদ্ধে একদিকে যেমন ১০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার তথ্য মিলেছে, অন্যদিকে অসহায় মানুষকে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকির অডিও ক্লিপ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল।
গত শনিবার (৭ মার্চ) মান্দার শ্রীরামপুর মধ্যপাড়া গ্রামে এক তণ্ডবলীলার সাক্ষী হলেন এলাকাবাসী। জমি সংক্রান্ত বিরোধের জেরে অসহায় মৃত তৈয়ম প্রামানিকের ছেলে রজব আলীর পরিবারের ওপর হামলা, গাছ নিধন এবং পুকুরের মাছ লুটের সময় ভুক্তভোগীরা বারবার জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল দিলেও কোনো সহায়তা মেলেনি। অভিযোগ উঠেছে, ওসির প্রত্যক্ষ মদদে পুলিশ ঘটনাস্থলে যেতে গড়িমসি করে, যাতে হামলাকারীরা কয়েক ঘণ্টা ধরে তাণ্ডব চালানোর সুযোগ পায়।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, ভুক্তভোগী পরিবারটি যখন থানায় আইনি সহায়তা চাইতে যায়, তখন ওসি মাসুদ রানা তাদের সান্ত্বনা দেওয়ার বদলে উল্টো ধমক দেন। ভাইরাল হওয়া অডিও ক্লিপে তাকে বলতে শোনা যায়, “বেশি বাড়াবাড়ি করলে বা বেশি কথা বললে মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলায় ফাঁসিয়ে দেব।” একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তার মুখে এমন হুমকিতে পুরো জেলায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
মান্দার প্রসাদপুর কওমি মাদ্রাসায় রফিকুল ইসলাম নামের এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ওসি মাসুদের ‘তেলেসমাতি’ এখন ওপেন সিক্রেট। পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে সাব্বির হোসেন নামের এক ঘাতক হত্যার দায় স্বীকার করলেও, অদৃশ্য কারণে ওসি সেই খুনিকে আড়াল করে ‘অজ্ঞাতনামা’ আসামিদের নামে মামলা নিয়েছেন। নিহতের ছেলে সাকিব হোসেনের দাবি, পুলিশ তাকে অন্ধকারে রেখে সাদা কাগজে স্বাক্ষর করিয়ে নিয়েছে। নেপথ্যে মোটা অঙ্কের লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাত্র ১৪ বছরের চাকরিকালীন সময়ে ওসি মাসুদ রানা বগুড়া শহরের পুলিশ লাইন্সের পেছনে, উপশহর ও সূত্রাপুরের মতো অভিজাত এলাকায় ১০ কোটি টাকা মূল্যের জমি ও প্লট কিনেছেন।
তার দুর্নীতির রেকর্ড পুরনো। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জ থানায় থাকাকালীন জব্দকৃত ট্রাক থেকে ২৩ লাখ টাকার পাম অয়েল ‘গায়েব’ করে দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান। তৎকালীন সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক ব্যবসায়ী সংবাদ সম্মেলন করে ওসির এই ভয়াবহ চুরির চিত্র তুলে ধরেছিলেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওসি মাসুদ রানা মান্দায় যোগদানের পর থেকেই সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ে মেতে উঠেছেন। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নেতাকর্মীদের ভয় দেখানো। কেউ প্রতিবাদ করলেই তাকে চাঁদাবাজির মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেওয়া। মাদক স্পট থেকে নিয়মিত মাসোহারা সংগ্রহ এবং পারিবারিক বিরোধকে পুঁজি করে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন তিনি।
ভাইরাল হওয়া অডিও ক্লিপ ও হুমকির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে ওসি মাসুদ রানা বরাবরের মতোই তা অস্বীকার করেন। তবে অডিওর সত্যতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
বর্তমানে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। পুলিশের একজন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তার এমন অপেশাদার আচরণ ও লাগামহীন দুর্নীতির বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার ও আইজিপির সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ও এলাকাবাসী।চলবে…