মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: রাজশাহীতে একের পর এক পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এর শিকার বেশিরভাগই শিশু বা কিশোর। গোসল করতে নেমে পানিতে তলিয়ে মারা যাচ্ছে। এদের অধিকাংশই সাঁতার জানতো না। কিন্তু এরপরও সাঁতারে আগ্রহ বাড়ছে না।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, ডুবে মারা যাওয়া শিশু কিশোরের ৯৫ ভাগই সাঁতার জানতো না। আর সাঁতার না জানার কারণ অনাগ্রহ এবং সুযোগ কমে যাওয়া।
চলতি বছর রাজশাহী শহরেই একাধিক পানিতে ডুবে মৃত্যুও ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে দুটি ঘটনা শহরে বেশ আলোচিত হয়। এর একটি ঘটে ১০ জুন পদ্মা নদীতে।
রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর এলাকায় পদ্মা নদীতে গোসলে নেমে নিখোঁজ হয় দুই বন্ধু। তারা হলেন- রাজশাহী নগরীর মেহেরচন্ডি এলাকার সাইদুর রহমানের ছেলে গোলাম সারোয়ার সায়েম (১৭) ও নগরীর দরগাপাড়া এলাকার মৃত খাজা মইন উদ্দিনের ছেলে রিফাত খন্দকার গালিব (১৭)। দুজনই রাজশাহীর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসির প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, পদ্মা নদীতে বর্তমানে কোথাও কম গভীর আবার কোথাও অনেক বেশি গভীরতা। এ কারণে সাঁতার না জানা অনেকেই নদীতে হাঁটা হাটি করতে গিয়ে হঠাৎ গর্তে পড়ে আর উঠতে পারে না। সায়েম এবং গালিবও এভাবেই গোসল করতে নেমে গভীর পানিতে তুলিয়ে আর উঠতে পারেনি। ১১ জুন দুই বন্ধুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
৩০ মে নগরীর হেতেম খাঁ গোরস্থান সংলগ্ন এলাকার একটি পুকুরে গোসলের সময় দুই শিশু ডুবে মারা যায়। এদের মধ্যে নির্ঝর নামে এক শিশুর বয়স ৯ বছর। আরেক শিশুর অনন্তের বয়স ৬ বছর। দুই শিশুর কেউই সাঁতার জানতো না। অনন্তকে ডুবে যেতে দেখে নির্ঝর তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যায়। কিন্তু নির্ঝরও সাঁতার জানতো না, ফলে দুজনই পানিতে ডুবে মারা যায়।
প্রবীণরা বলছেন, আগে ছোট বাচ্চারা সাঁতার জানতো। কিন্তু এখন অনেক বড় ছেলে মেয়েরাও সাঁতার শিখছে না। আবার বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে একজনের দেখাদেখি আরেকজন পুকুরে কিংবা নদীতে গোসলে নামছে। আর সাঁতার না জানার কারণে তারা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস অফিসের তথ্য মতে, চলতি বছরের শুরু থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ২৩টি ঘটনায় তাদের ডাক পড়ে। এসব ঘটনায় ১৪ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১২ জন ছেলে এবং দুজন মেয়ে। ৯ জনকে উদ্ধার করেন স্থানীয়রা।
অভিভাবকরা বলছেন, আগে বাড়ির পাশেই অনেক পুকুর থাকতো। এসব পুকুরই গোসলের প্রধান জায়গা ছিল। বাচ্চারা বাবা-মায়ের বা বড় ভাইবোনের কাছ থেকেই সাঁতারটা শিখে নিতো। এখন আর বাড়ির পাশে পুকুরও নেই। মানুষ গোসলও করেন বাড়িতেই। এ কারণে সাঁতার আর শেখা হয় না। আবার গ্রামে সাঁতার শেখার জন্য তেমন ব্যবস্থাও নেই।
বাংলাদেশ জাতীয় সাঁতার দলের সাবেক কোচ আলমগীর হোসেন বলেন, সাঁতার জানতে হবে। সাঁতার না জানার কারণে আমাদের দেশে প্রতিবছরই বহু মানুষ মারা যায়। মানুষ এটা বুঝতে পারে না যে শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের সাঁতারও শেখাতে হবে। অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে সাঁতার তাদরে শিশুর জীবন রক্ষা করতে পারে। তাই অনীহা না দেখিয়ে সাঁতার শেখাতে হবে।
রাজশাহী সদর ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, রাজশাহীতে যেসব শিশু ও কিশোররা পানিতে ডুবে মারা গেছে তারা প্রায় সবাই সাঁতার জানতো না। আমরা যখন তাদের পরিবারকে মরদেহ বুঝিয়ে দেই তখন তাদের কিছু তথ্য নিয়ে থাকি। সেখানে দেখা গেছে প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুই সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মারা যায়।
তিনি আরও বলেন, আমরা তো সব সময় প্রচার প্রচারণা চালাই। বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে সাঁতার শেখানোর বিষয়ে কথা বলি। তবে অভিভাবকরা আগ্রহ দেখায় না। তাদের কাছে সাঁতার শেখার সময় কম। কিন্তু এ সাঁতার শেখানোর জন্য অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে।
দ্য সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) সার্ভাইবেল সুইমিং এক্সপার্ট এনামুল হক বলেন, ২০১৬ সালে আমাদের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতিবছর ৩০ হাজার শিশু-কিশোর পানিতে ডুবে মারা যায়। দেশের ৮০ শতাংশ শিশুই সাঁতার জানে না। আমাদের পদক্ষেপে সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সাঁতার শেখা বাধ্যতামূলক করেছে। তবে স্কুলগুলোতে এখনো এটা চালু হয়নি।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই এটাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই না। কিন্তু তারা যে প্রাইভেট কোচিংকে গুরুত্ব দেয় সেই শিশু যদি পানিতে ডুবে মারা যায় তাহলে তার শিক্ষার তো কোন দামই থাকবে না। আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। সাঁতার শুধু প্রাণই বাঁচায় না, এটা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারও। বর্তমানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।
পানিতে ডুবে মৃত্যু
সাঁতার শিখছে না শিশু-কিশোর, পরিবেশকে দায়ী করছেন অভিভাবকরা
মাসুদ রানা রাব্বানী, রাজশাহী: রাজশাহীতে একের পর এক পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। এর শিকার বেশিরভাগই শিশু বা কিশোর। গোসল করতে নেমে পানিতে তলিয়ে মারা যাচ্ছে। এদের অধিকাংশই সাঁতার জানতো না। কিন্তু এরপরও সাঁতারে আগ্রহ বাড়ছে না।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, ডুবে মারা যাওয়া শিশু কিশোরের ৯৫ ভাগই সাঁতার জানতো না। আর সাঁতার না জানার কারণ অনাগ্রহ এবং সুযোগ কমে যাওয়া।
চলতি বছর রাজশাহী শহরেই একাধিক পানিতে ডুবে মৃত্যুও ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে দুটি ঘটনা শহরে বেশ আলোচিত হয়। এর একটি ঘটে ১০ জুন পদ্মা নদীতে।
রাজশাহী নগরীর শ্রীরামপুর এলাকায় পদ্মা নদীতে গোসলে নেমে নিখোঁজ হয় দুই বন্ধু। তারা হলেন- রাজশাহী নগরীর মেহেরচন্ডি এলাকার সাইদুর রহমানের ছেলে গোলাম সারোয়ার সায়েম (১৭) ও নগরীর দরগাপাড়া এলাকার মৃত খাজা মইন উদ্দিনের ছেলে রিফাত খন্দকার গালিব (১৭)। দুজনই রাজশাহীর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এইচএসসির প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, পদ্মা নদীতে বর্তমানে কোথাও কম গভীর আবার কোথাও অনেক বেশি গভীরতা। এ কারণে সাঁতার না জানা অনেকেই নদীতে হাঁটা হাটি করতে গিয়ে হঠাৎ গর্তে পড়ে আর উঠতে পারে না। সায়েম এবং গালিবও এভাবেই গোসল করতে নেমে গভীর পানিতে তুলিয়ে আর উঠতে পারেনি। ১১ জুন দুই বন্ধুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
৩০ মে নগরীর হেতেম খাঁ গোরস্থান সংলগ্ন এলাকার একটি পুকুরে গোসলের সময় দুই শিশু ডুবে মারা যায়। এদের মধ্যে নির্ঝর নামে এক শিশুর বয়স ৯ বছর। আরেক শিশুর অনন্তের বয়স ৬ বছর। দুই শিশুর কেউই সাঁতার জানতো না। অনন্তকে ডুবে যেতে দেখে নির্ঝর তাকে বাঁচাতে এগিয়ে যায়। কিন্তু নির্ঝরও সাঁতার জানতো না, ফলে দুজনই পানিতে ডুবে মারা যায়।
প্রবীণরা বলছেন, আগে ছোট বাচ্চারা সাঁতার জানতো। কিন্তু এখন অনেক বড় ছেলে মেয়েরাও সাঁতার শিখছে না। আবার বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে গিয়ে একজনের দেখাদেখি আরেকজন পুকুরে কিংবা নদীতে গোসলে নামছে। আর সাঁতার না জানার কারণে তারা দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস অফিসের তথ্য মতে, চলতি বছরের শুরু থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ২৩টি ঘটনায় তাদের ডাক পড়ে। এসব ঘটনায় ১৪ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ১২ জন ছেলে এবং দুজন মেয়ে। ৯ জনকে উদ্ধার করেন স্থানীয়রা।
অভিভাবকরা বলছেন, আগে বাড়ির পাশেই অনেক পুকুর থাকতো। এসব পুকুরই গোসলের প্রধান জায়গা ছিল। বাচ্চারা বাবা-মায়ের বা বড় ভাইবোনের কাছ থেকেই সাঁতারটা শিখে নিতো। এখন আর বাড়ির পাশে পুকুরও নেই। মানুষ গোসলও করেন বাড়িতেই। এ কারণে সাঁতার আর শেখা হয় না। আবার গ্রামে সাঁতার শেখার জন্য তেমন ব্যবস্থাও নেই।
বাংলাদেশ জাতীয় সাঁতার দলের সাবেক কোচ আলমগীর হোসেন বলেন, সাঁতার জানতে হবে। সাঁতার না জানার কারণে আমাদের দেশে প্রতিবছরই বহু মানুষ মারা যায়। মানুষ এটা বুঝতে পারে না যে শিক্ষার পাশাপাশি শিশুদের সাঁতারও শেখাতে হবে। অভিভাবকদেরও বুঝতে হবে সাঁতার তাদরে শিশুর জীবন রক্ষা করতে পারে। তাই অনীহা না দেখিয়ে সাঁতার শেখাতে হবে।
রাজশাহী সদর ফায়ার স্টেশনের সিনিয়র কর্মকর্তা আব্দুর রউফ বলেন, রাজশাহীতে যেসব শিশু ও কিশোররা পানিতে ডুবে মারা গেছে তারা প্রায় সবাই সাঁতার জানতো না। আমরা যখন তাদের পরিবারকে মরদেহ বুঝিয়ে দেই তখন তাদের কিছু তথ্য নিয়ে থাকি। সেখানে দেখা গেছে প্রায় ৯৫ শতাংশ শিশুই সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মারা যায়।
তিনি আরও বলেন, আমরা তো সব সময় প্রচার প্রচারণা চালাই। বিভিন্ন স্কুলে গিয়ে সাঁতার শেখানোর বিষয়ে কথা বলি। তবে অভিভাবকরা আগ্রহ দেখায় না। তাদের কাছে সাঁতার শেখার সময় কম। কিন্তু এ সাঁতার শেখানোর জন্য অভিভাবকদের আরও বেশি সচেতন হতে হবে।
দ্য সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশের (সিআইপিআরবি) সার্ভাইবেল সুইমিং এক্সপার্ট এনামুল হক বলেন, ২০১৬ সালে আমাদের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, প্রতিবছর ৩০ হাজার শিশু-কিশোর পানিতে ডুবে মারা যায়। দেশের ৮০ শতাংশ শিশুই সাঁতার জানে না। আমাদের পদক্ষেপে সরকার প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে সাঁতার শেখা বাধ্যতামূলক করেছে। তবে স্কুলগুলোতে এখনো এটা চালু হয়নি।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই এটাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাই না। কিন্তু তারা যে প্রাইভেট কোচিংকে গুরুত্ব দেয় সেই শিশু যদি পানিতে ডুবে মারা যায় তাহলে তার শিক্ষার তো কোন দামই থাকবে না। আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে। সাঁতার শুধু প্রাণই বাঁচায় না, এটা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারও। বর্তমানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।